প্রতিবেদন : চকিতা চট্টোপাধ্যায়

নাট্যকার: রাকেশ ঘোষ
রূপকল্প ও নির্দেশনা : শান্তনু দাস
প্রযোজনা : কল্যাণী কলামন্ডলম্
“যত মত তত পথ”… ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর এই বাণীর মধ্যে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্বরূপ চিরকাল আমাদের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর দেখানো সেইরকমই একটি পথকে কেন্দ্র করে লিখিত ও উপস্থাপিত হয়েছে ‘রাধারামকৃষ্ণ’ নাটকটি, গত ৯ জুন অ্যাকাডেমী অফ ফাইন আর্টস প্রেক্ষাগৃহে। নাটকটি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল রাকেশ ঘোষ লিখিত “অ্যান্ড্রোজিনি” সমন্বিত অন্যান্য নাটকগুলির মধ্যে ‘রাধারামকৃষ্ণ’ নিঃসন্দেহে সেরা এবং কল্যাণী কলামন্ডলম্ দলের একত্রিশতম জন্মদিনে এটিই দর্শকদের উপহার দেওয়া তাঁদের শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা !


শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের রাধাভাবের সাধনায় যে তাঁর দেহ ও মন উভয়ই নারীত্বে পর্যবশিত হয়েছিল, এই নাটকের মূল প্রতিপাদ্য হলো সেটাই। সমান্তরাল ভাবে আরও একজনও সাধনা করছিলেন সেই একই সময়,
গিরিশচন্দ্র ঘোষের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, যাঁর সাধনা ছিল নারী দেহে পুরুষসিংহ ‘নিমাই’ হয়ে ওঠার ! তিনি হলেন নটী বিনোদিনী। ভক্ত ও ভগবান সেদিন দুজনেই সেই সাধনায় যে একই সঙ্গে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, তার
সাক্ষী হয়ে আছে ইতিহাস !
প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই নির্দেশক শান্তনু দাসকে, প্রতিটি দৃশ্যের নান্দনিক রূপকল্প নির্মাণের জন্য। তাঁর সুশৃঙ্খল নির্দেশনায় প্রতিটি দৃশ্য যেন তাই এক একটি ছবি হয়ে ওঠে ! সেই সঙ্গে তাল মেলানো এক ঝাঁক অভিনেতার টিমওয়ার্ক বারবার করতালিমুখর করে তুলেছিল প্রেক্ষাগৃহ। কিছু কিছু দৃশ্য মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। যেমন পরমহংসদেবের রজঃস্বলা হবার দৃশ্যটি এবং অবশ্যই শেষ দৃশ্যটি।


সে যুগে এখনকার মতো লিঙ্গ নির্বিশেষে ‘অভিনেতা’ বলার রেওয়াজ বোধহয় ছিলনা, নিয়ম মতো পুংলিঙ্গ ও স্ত্রী লিঙ্গ অনুযায়ী কুশীলবরা নিজেদের ‘অভিনেতা’ বা ‘অভিনেত্রী’ বলতেন। কিন্তু তাহলে নাটকে একটি দৃশ্যে
বিনোদিনী গিরিশ ঘোষ ও অমৃতলালের সঙ্গে কথোপকথনের সময় নিজেকে “আমি একজন অভিনেতা” বললেন কেন?
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভূমিকায় মোনালিসা চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে শুরুতে এই চরিত্রে ‘লেজেন্ড’ হয়ে যাওয়া অভিনেতা গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছুটা ছায়া থাকলেও পরে তাঁর নিজস্বতা দিয়েই তিনি “যুগাবতার” হয়ে উঠেছিলেন। ভালো লেগেছে রঞ্জন বোসের ‘বিনোদিনী’কে ও অনন্যা দাসের ‘ভৈরবী মা’কে। তুলনায় গিরিশ ঘোষের চরিত্রের দাপট যেন কিছুটা কম পেলাম সমরেশ বসুর অভিনয়ে।
মনমুগ্ধকর ডান্স কোরিওগ্রাফি (পঙ্কজ সিংহরায়), আলোকসম্পাত ( আকাশপ্রসাদ), রূপসজ্জা ( ইস্রাফুল এপ্রিল, সঞ্জয় ঘোষ), ও সঙ্গীত (সুরজিৎ নন্দী) নাটকটিতে নিঃসন্দেহে আলাদা মাত্রা সংযোজন করেছে।