
প্রতিবেদন : চকিতা চট্টোপাধ্যায়
নাটক : স্ত্রী
মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটি গল্পের অনুপ্রেরণায়
নাট্যকার-নির্দেশক: সোমনাথ গুপ্ত
প্রযোজনা: কল্যাণী কলামন্ডলম্

স্ত্রী মাত্রই কি তার ওপর স্বামীর আধিপত্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত হয়ে যায়? কিন্তু যদি কখনও “জুয়াড়ীর বউ” ঝুমার মতো মুখ বুজে স্বামীর চাবুকের আঘাত সহ্য করে যাওয়া কোনো স্ত্রী, কিংবা গৃহপরিচারিকার স্বরোজগারের পরিপন্থী চোর-স্বামীর কল্পনার মতো কোনো স্ত্রী অথবা নিজের বাপের বাড়ি থেকে আনা টাকায় নির্মিয়মাণ দোকানটির সাইনবোর্ড থেকে তার নামই বাদ দিয়ে দেওয়া স্বামীর সরলার মতো স্ত্রী , কখনও নিজেদের মতো করে বাঁচার তাগিদে যদি মরিয়া হয়ে খুঁজে নিতে চায় পথ, তখনও কি তাদের দাঁড়াতেই হবে বিবেক নামক অর্ন্তদৃষ্টির মুখোমুখি?
কল্যাণী কলামন্ডলম প্রযোজিত মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত তিনটি ছোট গল্প“দোকানীর বউ”, “জুয়াড়ীর বউ”, “ চোরের বউ” থেকে অনুপ্রাণিত নাটক “ স্ত্রী”র মধ্যে দিয়ে নাট্যকার-নির্দেশক সোমনাথ গুপ্ত সেই প্রশ্নটিই দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন।



অলস দিনযাপনের একমাত্র অবলম্বন লুডোর ছক সাজাতে সাজাতে ঝুমা ছক কষেছিল তার মুক্তির। নিজের রোজগারের রাস্তাটুকুও যখন বন্ধ করার হুকুম জারি করল কল্পনার চোর-স্বামী, তখন ঘর ভাঙার পথে পা বাড়িয়েছিল কল্পনা। সরলার বাবার টাকায় দোকান তৈরী হলে যে সরলার নামটা সাইনবোর্ডে থাকতে দেবেনা তার
ষড়যন্ত্রকারী স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন সেটা বুঝতে পেরেই তাদের সবাইকে জব্দ করার ফন্দি আঁটতে হয়েছিল মরিয়া সরলাকে! আর তখনই তাদের তিনজনকেই মুখোমুখি হতে হয়েছিল সেই বিবেক নামক অর্ন্তদৃষ্টির।
একজন মুখোশধারীকে এই চরিত্রে সফল ভাবেই ব্যবহার করেছেন নির্দেশক। জোনাল আলো ও ব্যঞ্জনাময় সাজেস্টিভ সেটের ভেতর দিয়ে (মঞ্চ ও আলো শান্তনু দাসকৃত) তিন নারীর তিনটি সংসার দেখানো হয়েছে। জীবন যে সত্যিই শুধু ছক্কা-পাঞ্জা-পুটের খেলা তা বোঝাতে লুডোর ছকের ব্যঞ্জনাময় মঞ্চায়ণ বেশ ভালো লাগে। অভিনয়ে প্রত্যেকেই ছিলেন সাবলীল। তাঁদের টিমওয়ার্ক যেন এক সুরে বাঁধা ছিল। ভালো লাগে খেলনাওয়ালার পাসিংটি, এবং চুরি করা টেলিভিশন সেটের পর্দায় ভেসে ওঠা কল্পণার মুখ। কল্পনা যেন না থেকেও আছে এই দৃশ্যে !!


দু-একটি কথা তবু বলতেই হচ্ছে। মাঝে মাঝে দৃশ্যান্তরের পরিবর্তনের আবহ-সঙ্গীত ( নির্দেশককৃত) একটু যেন লাউড লাগে। নেপথ্য থেকে ঝুমার সঙ্গে কথা বলার সময় বাপ্পার গলা অতিরিক্ত লো থাকায় শোনার অসুবিধে হচ্ছিল। দৃশ্যান্তরের সময় আলো জ্বলে ওঠার পরেও কোনো কোনো অভিনেতা মঞ্চ ছেড়ে বেরোতে দেরি করে ফেলছিলেন। সরলা যখন অনিচ্ছাসত্বেও স্বামীর হাতে চায়ের কাপ বাড়িয়ে ধরল, তখন তার দ্রুত হাত বাড়ানোর ফলে চা চলকে পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু তেমন কিছু দেখা যায়নি এবং অভিনেতাদের অভিব্যক্তি বা বডি
ল্যাঙ্গুয়েজেও তেমন কিছুই বোঝা যায়নি।
মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী যে আজও কতখানি প্রাসঙ্গিক তা কিন্তু মনে করিয়ে দিয়েছে এই নাটক। এজন্য নাট্যকার-নির্দেশক সোমনাথ গুপ্ত এবং কল্যাণী কলামন্ডলম অবশ্যই অভিনন্দন প্রাপক।