প্রতিবেদকঃ কালচারাল talk


বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৌম্যদিপ্ত বসু ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িত থাকে।
করোনা পিরিয়ড চলাকালীন সৌম্যদিপ্ত লক্ষ্য করলো শিশুদের পড়াশোনা একাবারে শেষ হতে বসেছে। খাদ্যের টানে বেশ কিছু শিশু পড়াশুনা ছেড়ে শিশুশ্রমিক হয়েছে, মেয়েদের অল্প বয়সে তাদের অভিভাবকরা বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন।
এই সব দেখে সৌম্যদিপ্ত বসুর মনে হল একমাত্র বইই পারে এই দু:সময় থেকে সবাইকে মুক্তি দিতে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। পাঠাগারের ঘরে প্রয়োজন, এগিয়ে এলেন “দেরিয়া পাল বাড়ি”। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড: সনোজ কুমার পালের স্মৃতিতে তার বাড়িতে তৈরী হল “বোধিপীঠ পাঠাগার”। পাঠাগারের নামকরণ করলো বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগের পড়ুয়া সৈকত বালা।
শুরু হলো সৌম্যদিপ্তর স্বপ্নের প্রথম পদক্ষেপ।
তারপর গ্রামে গ্রামে তৈরী হতে থাকলো মুক্ত ও সাধারণ পাঠাগার। উৎসাহ পেল বাবা শুভেন্দু বসু ও মা দ্রৌপদী বসুর থেকে। এগিয়ে এল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ও প্রফেসরগণ। সোশ্যাল মিডিয়ার মারফৎ বই সংগ্রহ চলতে থাকলো।
সৌম্যদিপ্ত বসুর কর্মকান্ড দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হতে শুরু করল।অনেকেই সাহায্যের হাত বড়িয়ে দিলেন। যেমন “JDS Care ’87”, “সুখের চাদর”, “আমার শহর গড়িয়া চ্যারিটেবল ট্রাষ্ট”, “The Straight Talk”, “সাম্পান চ্যারিটেবল ট্রাষ্ট”, “Star search Family”, “Little Smile – Bangalore”, ” মাতৃভূমি ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট”, “জয়হিন্দ পাঠশালা ফাউন্ডেশন”, “ইডেন নার্সিং হোম”, “সোনার তরী” থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সংগঠন।
সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন পার্থ প্রতীম গুহ, অশোক বোস, বিলাস ঘোষ, সুদুর সুইজারল্যান্ডের থেকে রাজ পাল, কলিকাতা নিবাসী তানিমা পাল, মোবাস্বার হোসেন শাহ, ডা: প্রবাল পাত্র, অনাদী রঞ্জন হালদার, সুমন মন্ডল সহ অনেক মানবতাবাদী মানুষজন।


এর পর তৈরী হল “ভ্রাম্যমাণ বোধিপীঠ পাঠাগার”। একটা টোটো গাড়ী করে বই নিয়ে বিভিন্ন দূরবর্তী গ্রামে ঘুরে ঘুরে বই প্রেমী পাঠক তৈরী করা শুরু হলো। খরচ প্রচুর, কিভাবে হবে? এই ভাবতে ভাবতে এগিয়ে এল পরিবেশ বাদী সংগ্রহ “Green Tomorrow”। এই সংগঠন ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের কিছুটা খরচ বহন করছেন।
ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের দায়িত্বে আছেন শ্রী মলয় পাল,সোমনাথ ব্যানার্জি, বিশ্বজিৎ মন্ডল, রাজু মোকাম, বাপী হালদার, মুকুল হালদার, অমিতাভ মন্ডল সহ আরো অনেকেই।
আগামী পরিকল্পনা প্রচুর মানুষকে/ শিশুদের বইমুখী করা। সেই জন্য গ্রামে গঞ্জে শহরে হাটে বাজারে যেখানে যেমন সম্ভব হবে সেখানেই একটা মুক্ত পাঠাগার তৈরী করা।


ইতিমধ্যে ৬টা লাইব্রেরী তৈরী হয়েছে, শিশু পাঠক মনে বইয়ের প্রতি অমোঘ টান ভীষণ ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে প্রতিটি সদস্যকে। লাইব্রেরী তৈরী হয়েছে কিছু সহৃদয় মানুষের বাড়িতে আবার লাইব্রেরী আছে সেলুন দোকানে। যেখানে পাঠকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। উদ্দেশ্য বরণীয় ব্যক্তিদের স্মরণীয় কাহিনীকে শিশুমনে উপস্থাপনা করা, বিজ্ঞান চর্চা,সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ দেওয়া।
পরিকল্পনা চলছে বিভিন্ন কেজি স্কুল গুলোতে এই পাঠাগার তৈরী করা। কোনো গ্রামে লাইব্রেরী নেই আবার কোথাও বা লাইব্রেরী থাকলেও জীর্ণ দশা , নেই লাইব্রেরীয়ান । এই সব নানান প্রতিবন্ধকতার কারনে গ্রামের শিশু থেকে শুরু করে আপামর
একটা প্রজন্ম বঞ্চিত থেকে যায় সাহিত্যের যুগান্তকারী সব সৃষ্টি থেকে শুরু করে বিশ্ব পরিচয়ের সহজপাঠ প্রতিটা বিষয়েই। তাই CIDP (Centre For Integrated Development Practices) ও সমাজের প্রতিটা বইপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে শুরু হয়েছে ”বোধিপীঠ”, সাধারণের জন্য গৃহ ও মুক্ত পাঠাগার । প্রতিটা গ্রামেই ছোট ছোট আয়তনে গড়ে উঠবে একেকটি পাঠাগার । আট থেকে আশি সবাই স্বাদ নিতে পারবে বইয়ের । সুন্দরবনের সাথে লাইব্রেরীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে সৌনক।


“শিশুদের হাতে বই তুলে দিন”, এই বাক্যটিকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ “বোধিপীঠ পাঠাগার” এর পথ চলা। কি হবে আর কি হবে না, এই হিসাবের মধ্যে না গিয়ে, দেখাই যাক না কি হয়! গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ পাঠাগারকে নিয়ে। উৎসুক পড়ুয়ারা ব্যস্ত তাদের পছন্দের বই বাছতে, শিশুরা বাড়িতে গিয়ে তাদের বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে আসছে,বাবা-মা রাও প্রবল উৎসাহে ছুটে আসছেন তাদের সন্তানদের হাতে তাদের পছন্দমতন বই তুলে দিতে।
কেউ কেউ আবার তাদের পছন্দের গল্পের বইয়ের অর্ডার দিয়ে দিচ্ছেন। প্রথম দিন থেকেই খুব ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
দেরিয়া গ্রামেই আজিত পরামানিকের সেলুন দোকানে “বোধিপীঠ পাঠাগার” এর একটা শাখা আছে। অনেকেই সেখান থেকে বই দেওয়া নেওয়া করেন। আবার দোকানে অবসর সময়ে বই পড়ে অপেক্ষা করেন কখন তার সময় আসবে চুল কাটার।
এক ব্যক্তি জানালেন, ঐ সেলুন দোকানে চুল কাটতে গিয়ে দেখতে পান কয়েকটি শিশু বই নিয়ে পড়তে বসেছে। জিজ্ঞাসা করতে তারা বলে যে, প্রায় সময় দোকানে এসে ওরা বই পডে, আবার খাতায় লিখে বই বাড়ি নিয়ে যায়।
”বোধিপীঠ পাঠাগার “ এর সকল সদস্য ধন্যবাদ জানায় তাদের, যারা এই পাঠাগার তৈরীতে সহযোগিতা করেছেন।
সমস্ত পরিকল্পনা রূপায়নে আছেন সৌম্যদিপ্ত বসু ।
কালচারাল talk এর পক্ষ থেকে সৌম্যদিপ্ত বসু এবং ”বোধিপীঠ পাঠাগার “ এর প্রত্যেককে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন …