প্রতিবেদক – শিবাজী ঘোষ

আমি: কি রে রেমাল বামাল সমেত কোথায় ধরা পড়ল ?
বন্ধু ১: আরে সে তো রাত ১১টা নাগাদ সুন্দরবনে ধরা পড়ার কথা।
আমি: ও তাই বল। আমি তো ঝড়-বৃষ্টির ভয়ে আড্ডায় আসবো কিনা ভাবছিলাম। কিছু হলো না দেখে এই ৯টায় তে এলাম।
বন্ধু ২: দুর ওই সব নিয়ে মিডিয়া বেশি ভয় দেখায়। আসলে ওরা আজকাল ভয় বিক্রি করে।
আমি : তা যা বলেছিস মাইরি। ব্যাটারা আবার কাউন্ট ডাউন শুরু করেছে , ভাবতে পারছিস কোথায় নেমেছে এরা।
বন্ধু ১: ছাড় ওই সব, কি করলি এতক্ষণ ?
আমি: আমির খান প্রযোজিত ও কিরণ রাও নির্দেশিত ‘লাপাতা লেডিস’ ছবিটা দেখলাম। খুন,মারামারি,যৌনতা ছাড়াও যে এত ভালো সিনেমা বানানো যায় তার একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এই সিনেমাটা। অনেকদিন পর দারুণ একটা হিন্দি সিনেমা দেখলাম রে।
বন্ধু ২: হ্যাঁ নেটফ্লিক্স এ আছে, দেখব দেখব করে দেখা হচ্ছে না।
আমি: হ্যাঁ ঠিক। অবশ্যই দেখবি।
বন্ধু ১: কি নিয়ে রে গল্প টা?আমি: আমরা যখন ট্রেন এ করে দূরে কোথাও ঘুরতে যাই, দেখবি অনেক ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে যাই। সেই রকমই একটি গ্রাম্য জীবনের গল্প। পটভূমি উত্তর ভারতের কোনো একটি গ্রাম। প্রথমেই দেখা যায় মেয়ে-জামাই বিয়ের পরে বিদায়ী অনুষ্ঠান। ওরা প্রথমে বাস এ, তারপর ট্রেন এ উঠল। ট্রেন এ জেনারেল কম্পার্টমেন্ট এ আরো দুই জোড়া নব বিবাহিত। বউ রা একই রকম ভাবে ঘোমটা মাথায়। আমাদের গল্পের নায়ক তার বউকে নিয়ে নির্দিষ্ট স্টেশন এ নামল। সেখান থেকে আবার একটি বাসে করে নিজের বাড়িতে পৌঁছালো। বধূবরণ এর সময় শাশুড়ি ঘোমটা খুলে দেখে এই বউ তো তাদের ছেলে দীপক এর বউ ফুল নয়। কি কান্ড!!! সবাই হায় হায় করে উঠল। এ কি করে সম্ভব ! দীপক এই রকম একটি আহাম্মক এর মত কাজ কি করে করল।
বন্ধু ৩: সে কি রে, এই রকম আবার হয় নাকি ?
আমি: ওটাই তো গল্পের প্রথম টুইস্ট। দীপক বলে একই রকম তিন জন লেডিস থাকাতে, সে তার বউ ফুলকে চিনতে পারে নি। অপরিচিত বধূটিও বলে ঘোমটা থাকায় সে কার সাথে ট্রেন থেকে নেমে এল বুঝতে পারে নি। এর পর দীপক তার বন্ধুদের নিয়ে আবার স্টেশন যায়, কিন্তু ট্রেন তো চলে গেছে। পরদিন সে পুলিশ এর কাছে গিয়ে ডায়েরি করে। তার বউ লাপতা অর্থাৎ হারিয়ে গেছে। ওদিকে ফুল তো আরো পরের একটি ষ্টেশন এ অন্য বরের সাথে নামে। সেই ছেলেটি ও একই ভুল করে। তবে সে স্টেশনেই ভুল বুঝতে পেরে ফুলকে ছেড়ে চলে যায়। ফুল ওই ষ্টেশন এবং ষ্টেশন এর চা সিঙ্গারার দোকানের মঞ্জু মা, ছোটু আরো সবাইকে আপন মনে করতে শুরু করে। কিন্তু সব সময় মনে আশা রাখে যে তার বর দীপক নিশ্চয়ই তাকে খুঁজতে আসবে। দীপক তার ফুলকে খুঁজে না পাওয়ার কষ্ট, দর্শকের মন খারাপ করে। গল্প ক্রমশ এগোয় অজানা বধূ জয়া ওরফে পুষ্পা রাণীর রকম সকম দেখে। দীপকের এলাকার পুলিশ ইন্সপেক্টর মনোহর, পুষ্পা রাণীর শশুর বাড়ির এলাকার পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং ফুল যেই ষ্টেশন এ আছে, সেখানকার ষ্টেশন মাষ্টার এর পারদর্শীতার ফলে দীপক এবং ফুল এর মিলন সম্ভব হয়। পুষ্পা তার উচ্চ শিক্ষার জন্য দেহারাদুন যেতে সক্ষম হয়। এই হল গল্প। আরও অনেক ঘটনা আছে, বলব না, তাহলে ছবিটা দেখার মজাটা পাবি না।
বন্ধুরা : বুঝলাম। কিন্তু এই রকম একটি ছোট ঘটনা নিয়ে সিনেমা?
আমি: হ্যাঁ রে। এটা শুধু হারিয়ে যাওয়া কনের কাহিনী নয়। দেখানো হয়েছে এক মেয়ের স্বপ্নের কথা, দেখানো হয়েছে এক মেয়ের আত্নবিশ্বাস এর কথা। আমাদের চারপাশের দুনিয়াটা অত সোজা নয় ! নয় কোন একা মেয়ের একলা থাকার জায়গা। কিন্তু ! আবার কিছু ভালো লোক এখনো রয়েছে, এই পৃথিবীতে, যাদের বিশ্বাস করতে পারি। এটি নিঃসন্দেহে ২০২৪ এর অন্যতম সেরা ছবি। হাস্যরসের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে কিছু নারী অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরেছে এ চলচ্চিত্র, যার মধ্যে তিনটে সংলাপ আমাকে বেশ ছুঁয়ে গেছে—
১) “মহিলাদের মুখ ঢেকে রাখবেন কেন? তাঁর মুখ তার প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়”
২) “বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে নারীদের শ্বাশুড়ি হয়, ননদ হয়, জা হয়, পিসিমা হয় কিন্তু বান্ধবি হয় না। একজন বিবাহিতা নারীর একজন বান্ধবীর খুব প্রয়োজন” এবং ছায়া কদম দ্বারা অভিনীত “মঞ্জু মা” এর চরিত্র বলে,
৩) “একার সংসার প্রচণ্ড কঠিন, কিন্তু নারী যেদিন একা থাকতে শিখে যাবে সেদিন পৃথিবীর অর্ধেক দুঃখ তাকে ছুঁতে পারবে না” ও এই মঞ্জু মায়ের আরেকটা কথাও আমাকে বেশ ভাবিয়েছে— “পুরুষমানুষ ভাবে ভালোবাসলে গায়ে হাত তোলার অধিকারটাও তাদের থাকে, কিন্তু নারী যখন ভালোবেসে তাদের মতোই গায়ে হাত তোলে, পুরুষ সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে যায়” আর হয়তো এই কারণেই পুরুষমানুষ জিতে যায়।
৪) ফুল জয়াকে বলে তুমি না থাকলে আমাদের স্বামী স্ত্রীর মিলন হত না। এর উত্তরে জয়া বলে আর তুমি যদি না থাকতে, আমি আমাকে পেতাম না।
বন্ধু ১: আরে সাবাশ কি সুন্দর ডায়ালগ।


আমি: জানিস তো সিনেমাটায় প্রত্যেকে নতুন কিংবা অল্প পরিচিত আর্টিস্ট। কিরণ রাও দেখিয়ে দিল যে ভালো ছবি বানাতে গেলে নামি দামি আর্টিস্ট না হলেও চলে। এবং অল্প বাজেট এও ছবি করা যায়। হিরো উড়ে এসে গুণ্ডাদের শায়েস্তা করবে, নায়িকা সুইজারল্যান্ড এ গিয়ে নাচবে, এই সব ছাড়াও সিনেমা হয়।
বন্ধু ২: তা যা বলেছিস। কেমন অভিনয় করেছেন সবাই
আমি: এক কথায় প্রত্যেকে অসাধারণ। দীপক এর ভূমিকায় স্পর্শ শ্রীবাস্তব, ফুল – নিতাংশী গোয়েল, জয়া/পুষ্পা রানি – প্রতিভা রান্তা, মঞ্জু মা – ছায়া কদম। তবে সবার মন জয় করে নেবে ভোজপুরী সিনেমার নায়ক রবি কিষাণ। অসম্ভব ভালো অভিনয়। মুখে সব সময় পান গুঁজে কথা বলা সহজ নয় বাপু। অনেক সময় তো মনেই হয়নি যে এরা অভিনয় করছে। শুনলাম রবি কিষাণকে টোটাল ৩০০ এর বেশি পান খেতে হয়েছে। ও হ্যাঁ বলা হয়নি, ছবিতে দুটো গান মনকে তৃপ্তি দেয়। অরিজিৎ সিং এর গাওয়া – “ও সজনী রে”, শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে “ধিমি ধিমি”।
বন্ধু ১: তার মানে আড়ম্বরহীন গ্রাম্য জীবনের ক্যানভাসে সরলতা আর মিষ্টি প্রেমের নিটোল গল্প বলেছেন কিরণ রাও।
আমি: একদম ঠিক। আমার তো মনে হয় এই বছর কিরণ বেস্ট ডিরেক্টর ন্যাশনাল আওয়ার্ড পাবেই। সঙ্গে আরও অন্যান্য ক্যাটাগরিতে।
বন্ধু ৩: খুব সুন্দর লাগল ছবিটা দেখে তোর অভিজ্ঞতা শুনে। আজকাল ওয়েব সিরিজ গুলোও খুব সুন্দর হয়। পঞ্চায়েত, কোটা ফ্যাক্টরি, ফ্যামিলি ম্যান ইত্যাদি সিরিজ গুলো আজও প্রমাণ করে সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছে যারা চায় ভালো গল্প। কিন্তু বাংলায় এই রকম সাধারণ গল্প নিয়ে সিনেমা হচ্ছে না কেন ?
আমি: সেই নিয়ে আর একদিন বসবো। নে চল এবার বাড়ি চল, ১০.৩০টা বাজে। আবার ধামাল এসে পড়বে।
বন্ধুরা: হা হা হা। ধামাল না রেমাল।
আমি: যাঃ গল্প করতে করতে আজ সিগারেট খাওয়া হল না। হা হা হা।
চিত্র সৌজন্যঃ Google