শিবতোষ সিংহ

বিছানায় খান দুই বালিশসহযোগে কিঞ্চিৎ গড়াগড়ি খেয়ে জগতের কল্যাণসাধন করছিলাম, এমন সময় কানে এলো ভদ্রমহিলার তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর, “লোকজনকে ঘরের বাইরে যেতে বারণ করে করে থামানো যাচ্ছেনা। আর এবাড়িতে একজন আছেন যাকে সাধ্যসাধনা করে খাটের বাইরেই নামানো যাচ্ছে না। গভর্ণমেন্ট জানতে পারলে প্রাইজ দিত নির্ঘাত। কিকরে যে একটা মানুষ সারাদিন স্রেফ বিছানায় শুয়ে কাটিয়ে দিতে পারে না দেখলে বিশ্বাস হবে না কারো।”
বিবাহিত পুরুষদের মাথার দুপাশে দুখানি বিপদসংকেত নির্ণয়কারী অদৃশ্য অ্যান্টেনা থাকে। তারা তৎক্ষণাৎ জানান দিলো এ সময় দিবানিদ্রার জন্য প্রশস্ত নহে। অগত্যা বিপুল হাইসহযোগে ভদ্রমহিলাকে যারপরনাই আশ্চর্যান্বিত করে ঘুমের ক্লাইম্যাক্স ছেড়ে গা হাত পা ঝেড়ে খাটে উঠে বসে বললাম “একটা গল্প বলি শোনো।” তিনিও খুশীমনে কাজের মাঝে কান খাড়া করে রাখলেন।
“সে অনেকদিন আগেকার কথা। হিমালয় থেকে এক শহরে এলেন এক সাধু। কেউ বলে তার বয়স একশো, কেউ বলে দেড়শো। তিনি নাকি দীর্ঘকাল হিমালয়ের এক গোপন গুহায় তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় সর্বক্ষণ তার হাতে থাকে একটি বীণা। সেই বাজনা নাকি একবার শুনলে আজীবন আর ভোলার নয়। নগরপালের অনুরোধে কেবলমাত্র একটিবার তিনি বাজাতে সম্মত হয়েছেন। তারপর আবার তিনি হিমালয়ে তার গুহায় ফিরে যাবেন। এই খবরে সারা শহরে একেবারে হইহই পড়ে গেল। বহুমূল্য টিকিট সত্বেও মুহুর্তে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ।”
“তারপর?”
“তারপর অবশেষে এলো বহু প্রতীক্ষিত সেই সন্ধ্যা। ধীরে ধীরে মঞ্চের পর্দা সরতে দেখা গেল মঞ্চে আসীন সাধুবাবা। তার একটু পরে সেই বীণা থেকে একখানি বিচিত্র আওয়াজ ভেসে এলো।
প্রীং !
তারপর ঈষৎ নীরবতা।
তারপর পুনরায় প্রীং! এবং পুনরায় নীরবতা।
এইভাবে প্রীং এবং নীরবতার ইনফাইনাইট সিকুয়েন্সের মাঝে একসময় সাধুবাবা জানিয়ে দিলেন আজকের মতো বীণাবাদন সমাপ্ত !
মানে কি? মামদোবাজি? এতগুলো টাকার টিকিট! লোকজন তো ভয়ানক রেগে এই মারে কি সেই মারে। হলময় সে যাকে বলে চূড়ান্ত হইচই, হট্টগোল, হুলুস্থুল মিলিয়ে এক কেলেঙ্কারী কান্ড।
এর মাঝে সাধুবাবার মিহি গলা পাওয়া গেল
“বাজনা ভালো লাগেনি বুঝি?”
“ইয়ার্কি হচ্ছে?” রে রে করে উঠলো সবাই। “এটা কি একটা বাজনা? হাত পর্যন্ত নড়েনি একফোঁটা। কেবল প্রীং প্রীং প্রীং? এর থেকে তো আমাদের শহরের বাজিয়েরা হাজারগুণ ভালো।”
সাধুবাবা দাড়ি চুলকে টুলকে বললেন “তাই? তা তারা কি করে?”
“তারা চড়ায় ওঠে, খাদে নামে, কত কি করে। জানেন দ্রুতলয়ে তাদের হাত যন্ত্রের এমাথা ওমাথা এমন চলে যে আঙুল পর্যন্ত দেখা যায় না?”
শুনে সাধুবাবা মিষ্টি হেসে বললেন, “শুধু এইটুকুর জন্য এতো রাগ ? ওরা কি আর এমাথা ওমাথা এমনি করে রে? ঠিক জায়গাটা খুঁজে বেড়ায়। আর আমি সেটা পেয়ে গেছি। তারপরে আর দৌড়ে বেড়ায় কেউ?”
———————————-
ভদ্রমহিলা আমার মতো নন মোটেই। সিরিয়াস টাইপ। শেষের লঘু ট্যুইস্টটা একেবারেই নিতে পারবেন না জানতাম।
“এটা একটা গল্প হলো? অসহ্য। জঘন্য গুলবাজি যতো। যেমন লোক তার তেমনি গল্প।”
“আহা বুঝলে না। বিষয়টা সেটা না।”
“তো বিষয়টা কীইই?” ভদ্রমহিলার উষ্মা চরমে।
“বিষয়টা হলো সাধুবাবার মতো আমিও যাকে বলে ঐ একেবারে আসল জায়গাটা পেয়ে গিয়েছি। তাই যে যত প্রাণ চায় যতখুশি এমাথা ওমাথা করুক গে, আমার বাপু এই পাশবালিশেই প্রীং!!!”
বলে বিস্ময় ও হতাশামাখা একজোড়া রোষকষায়িত নয়নের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ছেড়ে আসা ঘুমের ক্লাইম্যাক্সে ফিরে গেলাম আমি।
